ইতিহাসের অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি: ১৫ আগস্টের বিতর্কিত দাদা, আর ৫ আগস্টের কলঙ্কিত নাতনি
সদ্য প্রয়াত কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনার মৃত্যুর পর তাঁর দাদা কর্নেল হামিদের পঁচাত্তরের ভূমিকা এবং নাতনির চব্বিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল বিশ্লেষণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা। ১৯ মে ২০২৬
ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের অকালমৃত্যু দেশের একটি মহলে শোকের ছায়া ফেললেও, এর পাশাপাশি জন্ম দিয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনার। মাত্র ৩১ বছর বয়সে তাঁর এই বিদায়ের পর সচেতন মানুষ ও নেটিজেনরা মেলাতে শুরু করেছেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমীকরণ। কারিনার দাদা ছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময়কার তৎকালীন ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ। পঁচাত্তরে দাদার সেই বিতর্কিত ভূমিকার সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নাতনি কারিনার কর্মকাণ্ডের এক বিস্ময়কর ও কলঙ্কজনক মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।
ইতিহাসের পাতায় একটি পরিবার কীভাবে দুটি ভিন্ন যুগে, দেশের দুটি চরম ক্রান্তিলগ্নে বিতর্কিত হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, তা নিয়ে এখন চলছে জোর আলোচনা।
দাদা ও নাতনির ঐতিহাসিক মিল: ১৫ আগস্ট ও ৫ আগস্ট
ইতিহাসবিদ ও বর্তমান প্রজন্মের বিশ্লেষকেরা দাদা ও নাতনির কর্মকাণ্ডের মধ্যে দুটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক মিল তুলে ধরেছেন:
বধ্যভূমি পরিদর্শন বনাম গণভবন লুটপাট:
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ঘাতকেরা যখন সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে, তখন ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার ছিলেন কর্নেল হামিদ। সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল বিদ্রোহ দমন করা। কিন্তু তিনি তা না করে, বরং অন্যতম প্রথম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি খুনি মেজরদের বাধাদানের বদলে তাঁদের পাহারায় বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা নিথর দেহ ঘুরে দেখেন।
গণভবনে উল্লাস:
ঠিক ৪৯ বছর পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পরপরই নাতনি কারিনা কায়সার ও তাঁর পরিবার (বাবা কায়সার হামিদসহ) গণভবনে প্রবেশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও সমালোচকদের দাবি অনুযায়ী, সেদিনের সেই চরম অরাজকতার সময় তাঁরা গণভবন থেকে ল্যাপটপ, ভ্যানিটি ব্যাগসহ নানা ব্যবহার্য সামগ্রী নিয়ে হাসিমুখে উল্লাস প্রকাশ করেন। দাদার মতো নাতনিও রাষ্ট্রের এক চরম বিপর্যয়ের দিনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তবে এবার নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে নয়, বরং লুটপাটের উল্লাসে।
নতুন শক্তির সুবিধাভোগী ও ক্ষমতার পালাবদল
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরপরই স্টেশন কমান্ডার কর্নেল হামিদ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি উপসেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের কাছে যান এবং তাঁকে খবরটি নিশ্চিত করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ক্ষমতার পালাবদলে কারা কেন্দ্রে আসছেন, তা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরে তিনি অভ্যুত্থানকারী ও নতুন শক্তিকে সমর্থন জুগিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, সমালোচকদের অভিযোগ—২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের ক্ষেত্রে নাতনি কারিনাও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে বিদেশি ‘ডিপ স্টেট’ বা নতুন শক্তির ‘সফট এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করেছেন। তরুণ প্রজন্মের আবেগকে কাজে লাগিয়ে দেশে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হয়েছিল, তার অন্যতম অনুঘটক ছিলেন এই কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তাঁরা সেই বিজয়ের সুবিধাভোগী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেন।
মোহভঙ্গ জনতার আক্ষেপ
কারিনার মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সেদিনের আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী ও খেটে খাওয়া মানুষের চরম মোহভঙ্গ হয়েছে। ৫ আগস্ট গণভবনে কারিনাদের মতো পরিচিত মুখদের লুটপাটের ভিডিওগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের সে সময়ই চরমভাবে লজ্জিত করেছিল। আজ অনেকেই উপলব্ধি করছেন, সেদিন কোনো আদর্শিক বিপ্লব হয়নি, বরং দেশপ্রেমিক ও আপসহীন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে সরাতে একটি সুপরিকল্পিত বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়িত হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, “কারিনাদের মতো ইনফ্লুয়েন্সাররা সে সময় আমাদের ইমোশন নিয়ে খেলেছে। আজ বুঝি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য শেখ হাসিনা কতটা দরকারি ছিলেন।”
ইতিহাসের কাঠগড়ায়
মৃত্যু সব সময়ই বেদনার। কারিনা কায়সারের অকালমৃত্যুতে অনেকেই তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছেন। কিন্তু ব্যক্তি যখন ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, তখন তাঁর কর্মকাণ্ডের বিচারও ইতিহাস তার নিজের নিয়মে করে।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে দায়িত্বহীনতা ও খুনিদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থনের কারণে দাদা কর্নেল হামিদ যেমন ইতিহাসের পাতায় আজীবন এক সুবিধাবাদী চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত, ঠিক তেমনি চব্বিশের 5 আগস্টে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবমাননা ও গণভবনের লুটপাটের কারণে নাতনি কারিনাও এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইলেন। ইতিহাসের এই নির্মম পুনরাবৃত্তি যেন প্রমাণ করে—সময় বদলে গেলেও, কিছু মানুষের সুবিধাবাদী চরিত্র ও বিতর্কিত ভূমিকা অপরিবর্তিতই থেকে যায়।
